বুধবার, ১৯ মার্চ, ২০১৪

ও আলোর পথযাত্রী

ও আলোর পথযাত্রী
~কল্যাণী রমা

স্কুলে কত যে ছাইপাশ ‘Aim in Life’  রচনা লিখেছি। চাঁদে যাব। বিজ্ঞানী হ’য়ে সমুদ্রের নীচে ক্লাউন ফিশের সাথেই বুঝি ঘুরে বেড়াব। কিন্তু আলী আনোয়ার মেসোর পায়ে পায়ে গুটি গুটি ঘুরতে গিয়ে মনে হ’ল, যদি কোনদিন মেসোর বাড়ির সব বই পড়ে ফেলতে পারি, আমার আর খাওয়া দাওয়া করতে হবে না। ঠিক হ’য়ে গেল। এটাই হচ্ছে আমার ‘Aim in Life’  রচনার গুরুগম্ভীর বিষয়বস্তু। ভবঘুরে আমি জীবনভর কোথায়, কোথায় যে ঘুরে বেড়ালাম। কখনো সত্যিকারের জীবনে। কখনো স্বপ্নে। অথচ কোথাও আমি এত বই কারো বাড়িতেই দেখিনি। আলী আনোয়ার মেসোর বাড়ির দেওয়াল ইঁটের বদলে বই দিয়ে গাঁথা। অবশ্য কোন সিমেন্ট নেই। মেসো, মাসির  ভালোবাসা সে বাড়ির গাঁথুনি। মাথায় ছাদ ভেঙ্গে পড়ে না। শুধু যখন যে বই দরকার হাত বাড়িয়ে টেনে নিলেই হ’ল। 



সেই ছেলেবেলা থেকেই তো আমার বাবা নেই। কোন কিছু শিখতে হ’লে, দেখাতে হলেই মা আমাকে মেসোর কাছে পাঠিয়ে দেয়। বহুবার ভেবেছি বাবা নেই ঠিকই, কিন্তু আমার তো আলী আনোয়ার মেসো আছে। কোন বইটা পড়া উচিত, কোন নাটক, কোন পেইন্টিং-টা দেখবার কথা, বোঝবার কথা – সে তো মেসো আমাকে সবসময়ই বলে দিচ্ছেন। যাদের বাবা আছে, তারা বুঝি বাবার কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি কিছু শেখে?  সত্যি?

তখন আমি ক্লাশ সিক্স না সেভেনে পড়ি। মেসো ইবসেনের, ইউজিন ওনিল-এর নাটকগুলো পড়তে বললেন। দেশে তখনও সিক্স, সেভেন-কে ছেলেবেলাই ধরে। আমি বুঝি আর না বুঝি, ‘Long Day's Journey into Night’, ‘When We Dead Awaken’ পড়ে ফেললাম। একদম আকাশের ওপারের আলো দেখলে মানুষের যে অবস্থা হ’য়, আমারও তাই। হ্যাঁ, একেই লেখা বলে। হাত টাত ঝেড়ে মনে হ’ল সব হ’য়ে গেছে। এবার মরে গেলেও আর কোন ক্ষতি নেই। কাজ শেষ। মেসো আমাকে দেখে ঠোঁটের কোণের চিরদিনের মুচকি হাসিটা দিয়ে বললেন, ‘কি রে, কি বুঝলি?’


একদিন সকালবেলা। গিয়ে দেখি মেসো বিছানার উপর বসে চা খাচ্ছেন আর টিভি দেখছেন। পাশেই মাসীর বানানো কোন একটা জিভে জল আসা জলখাবার। লেপ মুড়ি দেওয়া। জুবুথুবু অবস্থা। টিভিতে নানা কারুকার্য ক’রে ব্যায়াম ক’রা দেখাচ্ছে।

'কি করছেন, মেসো?'
'এক্সারসাইজ।'

আমি কোলকাতার লেকটাউনে সংসার পেতে বসেছি। মাসী, মেসো আমার কাছে কিছুদিন ছিলেন। স্বর্গ হাতে পেয়েছি। এদিকে মেসো এ ঘর ঘুরছেন। ও ঘর ঘুরছেন। তারপর বললেন, ‘হুঁম!’ মানে যেন, ‘যাক, বিয়ে টিয়ে ক’রে কানের দুল না কিনে এখনও বই কিনছিস্‌। নিঃশ্বাস প্রশ্বাস চালু আছে।’


একবার স্কুলের কি এক লেখায় মেসো বলে দিলেন, ‘এখানে Stoic  শব্দটা দে।’ আমি তো আনন্দে আত্মহারা। সেই বড় বেশি ছেলেবেলায় কে আর Stoic  লিখছে। সেদিন এও ভেবেছিলাম যে Stoic  শব্দের মানে আমি পুরোটাই বুঝে গেছি। আসলে যে কিছুই বুঝি নি, তাও আমি বুঝি নি।


কিডনি ফেইল করেছে। মেসোর লিভার ফেইল করেছে। ফুস্‌ফুস্‌ প্রায় চলছে না। এক মাসের উপর মুখ দিয়ে কিছু খান নি। জল পান নি। শরীর ফুলে গেছে। শরীরের ভিতর রক্ত ঝরছে। মুখে রক্ত শুকিয়ে আছে। কত টিউব চারদিকে। হাত বাঁধা। যেন ওষুধের টিউব খুলে না ফেলেন।


অথচ এ অবস্থাতেও তো আমরা মেসোকে ছেড়ে দিতে পারছি না। মেসোও আমাদের পথের মাঝখানে ছেড়ে দিয়ে চলে যাচ্ছেন না। কি জানি আমি হয়ত কোন একটা ইংরেজি বানান ভুল ক’রে ফেলব। হয়ত সুস্মিটা ঠিকমত কবিতাটা আবৃত্তি-ই ক’রে উঠতে পারবে না। জগত্‌শেঠ-এর অভিনয় করলেই কি হ’বে সুস্মি? এর পিছনের পুরো বিষয়টা বুঝতে হ’বে তো! হোস্নেয়ারা মাসি যদিও চিরদিন নিপুণ হাতে টেবিলের এ মাথা থেকে ও মাথা ভরিয়ে দিয়েছেন পোলাও, রোস্ট, রেজালা, কোর্মা, কাবাব, ঢাকাই পরোটা, কমলালেবু দিয়ে কই মাছ, ফুলকপির রোস্ট, আলুর চপ, সবজি দিয়ে মুগডাল, ডিমের হালুয়া, পুডিং, বোরহানি, ধুপি পিঠা, প্যানকেক সব সব দিয়ে। তবু মেসোকে তো বলতেই হ’বে সুস্মিকে, ‘তোর মা কে বল। দেখ শাড়ির আঁচলটা দিয়ে কেমন ক্যাম্পাস ঝাড়ু দিতে দিতে চলেছে।’ হয়ত নতুন বছর, হয়ত আমাদের জন্মদিন – সব বই, সব কার্ডে আলী আনোয়ার মেসো লিখে দিতেন। এমন কি হোস্নেয়ারা মাসীর নামটাও। মাসীর লেখা নাকি কেউ পড়তে পারবে না! অবস্থা দেখে মাঝে মাঝে আমি ভাবতাম, কি জানি। মেসো মাসীর ব্যাঙ্কের চেকটাও সই করে দিচ্ছেন কিনা। সেখানেও বানান ভুল হ’ল বুঝি।


২৮শে ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার সুস্মি আমাকে বলল, ‘আব্বা খুব খারাপ আছে। সময় নেই। কয়েক ঘন্টা থেকে কয়েক দিন।’ আমি ভালো বুঝতে না পেরে ভাবলাম হয়ত সময় আর এক ঘন্টা। এমন ঘামতে থাকলাম। মনে হ’ল আকাশ থেকে তারা ঝরে পড়ছে। আমার দৌড়ে গিয়ে দু’ মুঠো দিয়ে তা ধরতে হ’বে। এক সেকেন্ড দেরি ক’রা যাবে না। তা না হ’লে স্বর্গের তারা মাটিতে পড়ে সাত টুকরা হ’য়ে কাচের মত ভেঙ্গে যায় যদি। অথচ কিভাবে তাড়াতাড়ি যাব? আমার তো হেলিকপ্টার নেই! আমেরিকার গ্রামীন সম্পদ ধীর স্থির, বড় বেশি ছোট শহর এই ম্যাডিসন থেকে নিউ ইয়র্ক যেতে অনেক সময় লেগে গেল। মেসোকে মরফিন দিচ্ছে। হাতের সব বাঁধন খুলে দিয়েছে। সুস্মির ডাক্তার বন্ধুরা বলেছে যদি আর দুই একদিনের মধ্যে চাচা মারা না যান, ওঁনার চামড়া ফেটে শরীরের ভিতর জমে থাকা জল বের হ’বে। রক্তও?


মনে হ’ল ২৮শে ফেব্রুয়ারি থেকে ৩রা মার্চ মেসোর পা ছুঁয়ে, হাত ছুঁয়ে, কপাল ছুঁয়ে ছুঁয়ে, হাসপাতালে হোস্নেয়ারা মাসীর সাথে, আমাদের চিরকালের রাতজাগা পাখি শমীর সাথে, সুস্মির সাথে মেসোর পাশের বিছানায় রাত কাটিয়ে হাদা গঙ্গারাম আমিও শেষ পর্যন্ত বুঝি Stoic শব্দের সত্যিকার অর্থটা বুঝতে পারছি।


ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনার খাওয়ার জন্য হাসপাতালের নীচের তলায় দু’ দু’টো ক্যাফে আছে। কিন্তু ভয়ে খেতে যেতে পারছি না। সুস্মির বাড়ি স্নান করতে, একটু ঘুমাতে যেতে মনে সায় পাচ্ছি না। এত্ত ভয় করছে। পা জড়িয়ে না থাকলেই যদি মেসো চলে যায়? আমাদেরই তো এ অবস্থা! আর হোস্নেয়ারা মাসি? কতদিন যে ঠিকমত খান নি, ঘুমান নি, জানি না। রুমের গেস্ট বিছানাটা অল্প দূরে ব’লে সারারাত মেসোর একদম কাছে একটা রিক্লাইনার চেয়ার টেনে নিয়ে তাতেই রাতে খুব অল্প ক্ষণের জন্য দু’ চোখের পাতা বুজছেন। মাঝে মাঝে মেসোর বিছানাতেই অল্প জায়গা ক’রে বসছেন। ‘তোর মেসো চোখ খুললেই সামনে আমাকে দেখতে পাবে।’ বললেন, ‘তোর বাবা সেই কবে চলে গেছেন। তোর মা’র তখন ২৭ বছর বয়স। কিন্তু আমি তো পারছি না।’ অল্প জল দিতে গেলে বলে উঠছেন, ‘আমাকে নিয়ে একদম অস্থির হবি না। আমি জল খাব কি? তোর মেসো একমাস জল খায় নি।’ একেই ভালোবাসা বলে? ভালোবাসার এত শক্তি?


হাসপাতালে সুস্মি ওর ফোনে খুঁজে খুঁজে মেসোর সব প্রিয় গান মেসোর কানের একদম কাছে নিয়ে বাজাচ্ছে
। জোরে জোরে বলছে, ‘শুনতে পারছ? আব্বা, শুনতে পারছ? তোমার প্রিয় গানগুলো বাজাচ্ছি।’ ‘সমুখে শান্তি পারাবার...’ , ‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে, দেখতে আমি পাই নি তোমায়, দেখতে আমি পাই নি...’, ‘ও আলোর পথযাত্রী...’
সুস্মি বলল ‘ও আলোর পথযাত্রী’ গানটা আব্বার খুব বেশি প্রিয়। আর আমি ভাবছি যা কিছু সুস্মি বাজাচ্ছে, সব তো আলী আনোয়ার মেসোকে নিয়েই লেখা। মেসোর চোখ বন্ধ। মেসো ঘুমিয়ে আছেন।

সবসময় সব জায়গায় খালি পায়ে ঘোরা আমার চিরদিনের ‘হবি’। সারা ছেলেবেলা আমি আলী আনোয়ার মেসোর বাড়ি খালি পায়ে ঘুরেছি। তারপর নিজের জুতা ওঁনাদের বাড়ির কোথায় যেন গুঁজে দিয়ে আলী আনোয়ার মেসোর জুতা পরে বাড়ি ফিরেছি। হাসপাতালেও এখন খালি পায়েই ঘুরছি। কানের কাছে সুস্মিটা ঘ্যাঁনঘ্যাঁন ক’রে চলেছে, ‘রমা, জুতা পর। এক্ষুনি জুতা পর। হাসপাতালে কত্ত জার্ম থাকে।’ ওকে তো আর বলতে পারি না, ‘মেসোর কাছেই তো ঘুরছি। দেবতার ঘরে জুতা পরতে নেই।’ এক চাটি মেরে নিশ্চিত বলবে, ‘সবসময় কাব্য করিস না। চিরদিন তুই যা বলিস তার ৭৫% বাদ দিয়ে কথা বিশ্বাস করতে হ’য়। এক্ষুনি জুতা পর।’


শুধু জুতা খুলেই ঘোরা তো নয়। বড়দের দেখলে তাদের পা ছুঁয়ে প্রণাম করাও আমার দ্বিতীয় ‘হবি’। যেখানে যা কিছু আশীর্বাদ পাওয়া যায়, মুঠো ভ’রে আমার ব্যাঙ্কে তা জমিয়ে তো রাখতেই হ’বে। আমার দুরাবস্থা দেখে সুস্মি তো নিগুঢ় রহস্যটা যেন আবিষ্কারই ক’রে ফেলল। ‘তুই ঠিক দই-এর ফোঁটা দিয়ে পরীক্ষা দিতে যাস্‌!’ লোভে পরে একবার কে যেন ঘুমিয়ে ছিল, তার পা ছুঁয়ে প্রণাম করেছিলাম। দিদার কি বকুনি! শোওয়া অবস্থায় কাউকে প্রণাম করতে নেই। মৃত্যুর লক্ষণ। ৩রা মার্চ সকালবেলা আলী আনোয়ার মেসো চলে গেছেন। এখন তো আর পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে ভয় নেই। এ কয়দিন শুধু পায়ে হাত বুলিয়েছি। এবার পা ছুঁয়ে প্রণাম করলাম।


হোস্নেয়ারা মাসী বললেন মেসো নাকি খুব গুরুগম্ভীর স্বরে কয়েকদিন আগেই বলছিলেন,

‘তোমরা সবাই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও
সুন্দর পোশাক পর
গরম জামা গায়ে দাও।’
মেসো চলে গেছেন। মাসী আমাকে জড়িয়ে বলছেন, ‘এই শাড়িটা সুন্দর না?  তোর মেসো মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হ’তে বলেছে।’  মাসীর পরনে ঘিয়ে রঙ্গের সিল্ক, ছোট ছোট কালো পাতা।


৫ই মার্চ, ২০১৪

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন